Home / ধর্ম-কর্ম / হাজীগঞ্জ এর ইতিহাস / হাজীগঞ্জের নামকরণ

হাজীগঞ্জের নামকরণ

চাঁদপুর জেলার এতিহ্যবাহী জনপদোর নাম হাজীগঞ্জ। বাংলা এগার’শ পঁচাত্তর থেকে বার’শ সালের দিকে হাজী মকিমউদ্দিন (রহঃ) নামে এক বুজুর্গ অলিয়ে কামেল ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পবিত্র আরব ভূমি হতে সপরিবারে এ অঞ্চলে আগমন করেন। চাঁদপুর-কুমিল্লা কোম্পানি রাস্তার উত্তর পার্শ্বে বর্তমান মসজিদের প্রথম অংশ যা একটি দ্বীপাকৃতি ভূ-খন্ড ছিল, বর্তমান মসজিদের মাঝখান এবং তৎপূর্বে নিম্নœভূমিসহ হজা-মজা, নালা-খাদা, ডোবা পুকুর। সেই হাজা-মজা ডোবা পুকুরের উত্তর-পশ্চিম কোণে তিনি তালপাতা ও খড় দিয়ে আস্তানা তৈরী করেন। আল্লাহ্র রহমতে কয়েক বছরের মধ্যে এ অলীয়ে কামেলের বার্তা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে আরম্ভ করে। দূর-দূরান্ত হতে প্রথমে মুসলমানগণ পরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরাও আল্লাহ্র অলীর উছিলায় নিজেদের মকছুদ হাসিলের জন্য নিয়ত মানতের হাদিয়া, নজর-নেওয়াজ নিয়ে পীরে কামেল হযরত মকিমউদ্দিন (রহঃ)’র দরবারে উপস্থিত হতে লাগলেন। আল্লাহ্র রহমতে উপকৃত হত বলে জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ে। পীর মকিমউদ্দিন (রহঃ)’র ধর্মীয় সদালাপ ও মধুর ব্যবহারে সকলে মুগ্ধ ছিল। হযরত মকিমউদ্দিন (রহঃ) তার দু’এক জন ভক্ত মুরিদসহ নিজ আস্তানায় তালিম প্রদান করতেন। মুরিদানের সংখ্যা বৃদ্ধি সাপেক্ষে প্রতি শুক্রবার জুময়ার দিন বর্তমান মসজিদের প্রথম অংশ বরাবর দক্ষিন দিকে পূর্ব পশ্চিম রোক কোম্পানি রাস্তার দক্ষিন পাশের্^ পুকুর পাড়ে চৌধুরী ঘাটে’ জুময়ার নামাজসহ মুরিদানের উপস্থিতি সাপেক্ষে প্রায়ই জামাতে নামাজ আদায় করতেন।

ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কালের বিবর্তনে অত্র এলাকায় নব্য মুসলিম ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মুসলমানদের আগমনে ধীরে ধীরে অত্র এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে উঠে। পর্যায়ক্রমে যা আজ মুসলিম জনপদের প্রধান এলাকায় পরিনত হয়।

হযরত মকিমউদ্দিন (রহঃ) ইহলোক ত্যাগের পর তাঁর নিজ আস্তানায় বর্তমান মসজিদের পশ্চিমে মেহরাবের ডানের একটু পশ্চিম অংশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। (ইন্নালিল্লাহে ………রাজেউন)। হযরত মকিমউদ্দিন (রহঃ) কর্তৃক এ এলাকায় ইসলামের প্রচার তথা আবাদ ঘটে। পীরে কামেল হযরত মকিমউদ্দিন (রঃ)র প্রভাব ও শ্রদ্ধা জনমনে এমনি গভীর রেখাপাত করেছিল যে, হিন্দুপ্রধান জনপদটি তাঁর নামানুসারে ‘মকিমাবাদ’ নামে আখ্যায়িত হয়; গড়ে উঠে মকিমাবাদ গ্রাম। আল্লাহপাকের দরবারে অনেক শুক্রিয়া।

হযরত মকিমউদ্দিন (রহঃ)র বংশের শেষ পুরুষদ্বয় হাজী মুতিউদ্দিন এবং তৎপুত্র হাজী মনিরউদ্দিন ওরফে মনাই হাজী (রহঃ) কর্তৃক পর্যায়ক্রমে গড়ে উঠা খানকা শরীফে আশ-পাশ হতে আগত ভক্তগণকে নিয়ে ধর্ম-কর্ম সম্পাদনের লক্ষ্যে মুরিদগণকে ছবক প্রদান করতেন। এক পর্যায়ে মুরিদানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং জুময়াকে কেন্দ্র করে মুসল্লিগণের নামাজের সুবিধার কথা চিন্তা করে হযরত মুতিউদ্দিন (রহ:) চৌধুরী ঘাটের পরিবর্তে হোগলা হাটে নামাজের ব্যবস্থা চালু করেন। সে সময়কার উত্তর দক্ষিণে প্রবাহিত খালের পাড়ে অর্থাৎ- মনাই হাজী (রহ:) বাড়ীর পশ্চিম অংশ বরাবর দক্ষিণে প্রবাহিত খালের দক্ষিনাংশের উচু স্থানে যা হোগলা হাট নামে পরিচিত ছিল। হযরত মুতিউদ্দিন (রহ:) হোগলা হাটে খড়, ছন এবং গোলপাতা দ্বারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। অল্প কিছুকাল পর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁকে তার পূর্ব পুরুষের আস্তানা বাগান বাড়ীতে সমাহিত করা হয়।

হযরত মতিউদ্দিন (রহ:)র পুত্র মনাই হাজী (রহঃ) সুন্নাতে রাসূল (সাঃ) হিসেবে মুসলমান ব্যবসায়ী গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বর্তমান মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ গেটের দক্ষিনাংশে আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহঃ) মাজারের একটু পূর্ব সীমানায় সে সময়কার নালা-খালের উত্তর পাড়ে খড় এবং গোলপাতা দ্বারা তৈরী একটি একচালা দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। পর্যায়ক্রমে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী তথায় মওজুদ রাখা ও সুলভে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেন।

পিতা মতিউদ্দিন (রহ:) ইহলোক ত্যাগের পর হাজী মুনিরউদ্দিন ওরফে মনাই হাজী (রহঃ)র দোকান, ব্যবসা-বাণিজ্যের কারনে লোকজনের আনা-গোনা একটু বেড়ে যায়। মনাই হাজী (রহঃ) পর্দার খেলাপ জনিত কারণে বসতী স্থানান্তরের চিন্তা করতে বাধ্য হন। আর সে কারনে বসতী স্থানান্তর করেন। পর্যায়ক্রমে বাড়িটি মনাই হাজী (রহঃ)র বাড়ি, যা প্রকারান্তরে ‘হাজী বাড়ি’ হিসেবে খ্যাত ছিল।

মনাই হাজী (রহ:)র উত্তরাধিকারী হিসেবে কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় পরবর্তী সময়ে তাঁর জামাতা ধনাঢ্য মুসলিম পরিবারের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী আহছান উল্লাহ পাটওয়ারী সাহেব উক্ত বাড়িতে অবস্থানের কারণে পাটওয়ারী সাহেবের সম্মানে ধীরে ধীরে বাড়িটি পাটওয়ারী বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

আহছান উল্লাহ পাটওয়ারী ও তার স্ত্রী জয়নব বানুর ঘরে প্রথম এক কন্যা খাদিজা বানু এবং এক পুত্র আহমাদ আলী পাটওয়ারী জন্ম গ্রহণ করেন।

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, মসজিদ এলাকাটি একটি দ্বীপাকৃতি ভূ-খন্ড ছিল। ছিল হাজা-মজা, ডোবা-নালা, নিম্নভূমি। আশেপাশে বলতে গেলে পুরো এলাকাটাই এমন ছিল। এর মধ্যে বোয়ালজুরি খাল হতে আগত পূর্ব হতে পশ্চিম দিকের খালটি বর্তমান মসজিদ মাঠের পূর্ব পার্শ্বে মোড় দিয়ে উত্তর হতে দক্ষিণে এসে বর্তমান পৌরসভা অফিস বরাবর উত্তর হতে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে এবং দক্ষিণে ডাকাতিয়া নদীর সাথে মিলিত হয়। কোম্পানির রাস্তার কাছে খালের উত্তর পাশ দিয়ে একটি ছোট শাখা অংশ পশ্চিমে মোড় নিয়ে কোম্পানির রাস্তা ঘেষে পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত ছিল, এরই একটি অংশ যা পূর্ব-পশ্চিমের কোম্পানি রাস্তার উত্তর পাশর্^ ঘেষে ডানে মোড় নিয়ে পরবর্তী সময়ে রাস্তা নির্মিত হওয়ায় তার পাশ দিয়ে সংযুক্ত হয়ে রেল ষ্টেশনেও পৌঁছেছে। নৌকা পথে লোকজন খাল দিয়ে পূর্ব পশ্চিমে যাতায়াত করত এবং প্রয়োজন বোধে আবশ্যকীয় দ্রব্য সামগ্রী চাল, ডাল, তেল, লবন ইত্যাদি মনাই হাজী (রহঃ)’র ‘হাজী দোকান’হতে কেনাকাটা করত। দক্ষিণ পাড়ে কোম্পানির রাস্তা দিয়ে লোকেরা সাঁকোর সাহায্যে এসে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র ক্রয় করত। এ হাজী দোকানের সুখ্যাতি লোকের মুখে রূপকথার ন্যায় চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর বর্তমান মাছ বাজারে উঁচু স্থানে বর্তমান জীর গাছের নিচে তিনি আরও একটি দোকান স্থাপন করেন। পর্যায়ক্রমে পূর্ব পুরুষের আস্তানা তথা বাগান এবং বসত বাড়ীর স্থানটিতে আরও কয়েকটি দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত স্থানটি ভাড়াটিয়া বাড়ীতে পরিনত হয়। হাজী সাহেবের উৎসাহে আরও দোকান গড়ে উঠে। দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজনের আগমন বেড়ে যায়। যতই সময় অতিবাহিত হতে থাকে হাজীর দোকানের সুখ্যাতি ততই বাড়তে থাকে।

পরম শ্রদ্ধেয় হযরত মনাই হাজী (রহঃ) সুন্নাতে রাসুল (সাঃ) হিসেবে ব্যবসায়ের দ্বার উম্মুক্ত করে ইহলোক ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহে……রাজেউন)। তাঁকে বর্তমান মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ কবরস্থানের পূর্বাংশে সমাহিত করা হয়। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত হাজী দোকান থেকে হাজির বাজার বিরাট এলাকার কেন্দ্রীয় বাজার হিসেবে জনমনে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। প্রথমে পবিত্র জুময়াকে কেন্দ্র করে প্রতি শুক্রবার বাজার বসত। অতঃপর শুক্র ও সোমবার বাজার গড়ে উঠে। পরবর্তীতে অন্যান্য দিনে সকাল বেলায় ‘হাট’ বসত। পর্যায়ক্রমে মনাই হাজী (রহঃ)র রুহানী দোয়ার বরকতে হাজীর বাজার বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। পর্যায়ক্রমে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কলিকাতার সাথে নদীপথে যোগাযোগ সমৃদ্ধ হয়। এভাবে সকলের পরম শ্রদ্ধেয় মনাই হাজী (রহঃ)’র দোকানের উছিলা ও সুখ্যাতিতে হাজী সাহেবের দোকান, ‘হাজী দোকান’; হাজীর হাট’, হাজীর বাজার’ হতে বর্তমান এই ‘হাজীগঞ্জ বাজার’-এর উৎপত্তি। পবিত্র এ নামকরণের সৌভাগ্যে আল্লাহ্র নিকট অনেক অনেক শুক্রিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.