Home / মসজিদ / হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কমপ্লেক্স

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কমপ্লেক্স

বাংলা তের’শ পঁচিশ থেকে ত্রিশ সালের দিকে আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) বর্তমান মসজিদের মেহরাব সংলগ্ন উঁচু স্থানজুড়ে একচালা খড়ের এবাদত খানা মসজিদ স্থাপন করেন। অতঃপর খড় ছনপাতা এবং গোলপাতা দিয়ে তৈরি দো’চালা মসজিদ থেকে দো’চালা টিনের মসজিদ নির্মাণ করেন। পর্যায়ক্রমে পাকা মসজিদ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)র পৈত্রিক সম্পদ-সম্পত্তি এবং পরম শ্রদ্ধেয় নানা হাজী মনিরুদ্দীন ওরফে মনাই হাজী (রহ.)’র ব্যবসা বাণিজ্যসহ সকল সম্পদ-সম্পত্তি দেখাশুনার পাশাপাশি নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা হিসেবে ১৩৩৭ বাংলায় হযরত মাও: আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.) দোয়া মুনাজাতের মাধ্যমে পাকা মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।

কাজ সমাপ্তির পর ১৩৪৪ সালের ১০ অগ্রহায়ণ প্রথম জুমার নামাজের আজান এবং পবিত্র জুময়ার নামাজের উদ্বোধনী জামাতে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ, কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নবাব মোশাররফ হোসেন ও নওয়াবজাদা খাজা নসরুল্লাহসহ ধর্মপ্রাণ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

পরবর্তী সময়ে উক্ত মসজিদে শুভাগমন করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মাও: আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ ইতিহাস প্রসিদ্ধ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ।

উক্ত মসজিদে শুভাগমনকারী ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য শায়খুল ইসলাম আল্লামা হোসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.), আল্লামা আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.), আল্লামা জাফর আহমদ উসমানী (রহ.), আল্লামা আতহার আলী (রহ.), আল্লামা এহতেশামুল হাক থানভী (রহ.)সহ আরও বহু হক্কানী পীর মাশায়েখ এবং শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও বুজুর্গানে দ্বীন।

প্রচ- মেধাশক্তির অধিকারী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ:) কর্তৃক পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পরপরই কোরআনী শাসনের দাবীতে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ প্রাঙ্গনে এক বিরাট ইসলামী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের এন্তেজামিয়া কমিটির সভাপতি ছিলেন রূপসার জমিদার সৈয়দ আবদার রশিদ সাহেব। বিভিন্ন শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা জাফর আহমাদ ওসমানী থানভী (রহঃ), মাওলানা আব্দুল হাই কোরাইশী (রহঃ) শর্ষিনা, মাওলানা আবু জাফর ছিদ্দিকী (রহঃ) আল-কোরাইশী ফুরফুরা শরীফ, যোগাযোগ সচিব থাকেন মাওলানা হাতেম (রহঃ) সাহেব নোয়াখালী। পাক ভারতের খ্যাতনামা ওলামায়ে কেরাম এই সম্মেলনে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদে তাশরিফ আনেন। সম্মেলন সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মূল সম্মেলনের সভাপতি আল্লামা মাওলানা হাকিম মোঃ আব্দুর রউফ দানাপুরী (রহঃ) পাকিস্তানে ইসলামী আদর্শভিত্তিক শাসন পদ্ধতি প্রবর্তনের লক্ষ্যে কোরআন ও সুন্নাহর পুরোপুরি বাস্তবায়নের উপর সুদীর্ঘ ভাষণ দান করেন। তার ভাষণের অনুলীপি কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল। আল্লাহ পাকের অশেষ মেহেরবানীতে প্রত্যন্ত এ অঞ্চলে পাক-ভারত উপমহাদেশের মধ্যে শীর্ষ স্থানীয় সম্মেলন উক্ত মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।

দেশের শর্ষী স্থানীয় মর্যাদাসম্পন্ন উক্ত মসজিদটি ৩টি অংশে ২৮৪০৫ বর্গফুট এক তলা মসজিদ নির্মিত হয়।

তৎসময়ে উক্ত মসজিদের মার্বেল পাথরের ফ্লোর এবং বিরল কারুকার্যখচিত  মেহরাবখানা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মসজিদের ভেতরে ঝুলানো হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন বড় বড় ঝাড়বাতি। আর নির্মাণ করা হয়েছিল বিরল কারুকার্যখচিত একটি কাঠের উঁচু মঞ্চ। দৃষ্টিনন্দন ঝিনুকের মোজাইক দিয়ে তৈরি সাতাত্ত¦রটি পিলারবিশিষ্ট মসজিদের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশ তৈরি হয়েছিল, যা ইতিমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। তৃতীয় অংশে নির্মাণ করা হয়েছিল তিনটি গম্বুজসহ আকর্ষণীয় একটি সুউচ্চ মিনার। মিনারের পাদদেশ দিয়ে বিশাল আকৃতির প্রধান ফটক বা শাহী গেট নির্মিত হয়েছে, যা এখনও যেকোনো চিন্তাশীল ব্যক্তিকে বিস্মিত করে তোলে।

আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি দ্বীনি এলেম সমৃদ্ধ জ্ঞানী মুসল্লি তৈরির লক্ষ্যে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের প্রতি গুরুতারোপ করেন। তার প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগে বর্তমানে যা আহমাদিয়া কামিল মাদ্রাসা ও আহমাদিয়া কাওমী মাদ্রাসা দুটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদ্রাসা দুটিতে দরিদ্র, এতিম, দুস্থ ও অসহায় শিক্ষার্থীদের দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে ধর্মীয় দিবস হিসেবে পবিত্র শবে-বরাত, পবিত্র শবে ক্বদর, পবিত্র শবে মেরাজ, পবিত্র আশুরা, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

উক্ত মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ প্রতি জুমায়ার নামাজ এবং পবিত্র রমজান মাসের জুমাতুল বিদার নামাজে প্রায় লক্ষাধিক মুসল্লির সমাগম ঘটে। তখন আশপাশের রাস্তাঘাট, ভবন এবং ভবনের ছাদসহ পুরো বাজার এলাকা মসজিদে পরিণত হয়। বিশাল এই মসজিদে রয়েছে মহিলাদের জন্য আলাদা নামাজ পড়ার সুব্যবস্থা।

আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) নামাজসহ প্রাসঙ্গিক সেবামূলক কার্যক্রমের ব্যয় নির্বাহের সুবিধার্থে স্থায়ী আয়ের উৎস হিসেবে সম্পদ-সম্পত্তি এবং দোকান ঘরের ব্যবস্থা করেছেন। এতে দ্বীনি কার্যক্রমে আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে শতশত মানুষের বিনিয়োগ এবং কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ওয়াক্বিফ ও মোতাওয়াল্লী আলহাজ¦ আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) সততার অনন্য প্রতীক, বিরল কর্মবীর এবং নিবেদিতপ্রাণ এক কালজয়ী মানুষ। তিনি তার জীবনে মোট তিনবার পবিত্র হজ¦ব্রত পালন করেন। এরমধ্যে দু’বার তিনি আকবরী হজ¦ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)’র মুরিদ ছিলেন। তিনি প্রতিদিন নিয়মিত পবিত্র কালামে পাক তেলাওয়াত করতেন। জীবনের সকল অবস্থায় তার মুখে উচ্চারিত হত ‘আল্লাহ ভরসা’। তাঁর কর্মকুশলতায় বাংলাদেশ, ভারত তথা উপমহাদেশের অনন্য মকবুলিয়াত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান অগণিত আল্লাহভীরু ও আত্মসমর্পণকারী বান্দার এবাদত, সেজদা ও দানের স্বাক্ষী হিসেবে সগৌরবে সুউচ্চ মিনার ও গম্বুজ সহকারে কালের স্বাক্ষী হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে।

বড় মসজিদ কমপ্লেক্সটি ইসলামের মারকাজ ধর্মীয় অনুপ্রেরণার অনন্য পাদপীঠ। এই মসজিদ কমপ্লেক্সটি ঈমান দীপ্ত চেতনায় উদ্ভাসিত প্রজন্মের মাঝে প্রেরণা যুগিয়ে যাবে চিরকাল।

আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র অনন্য অবদানসহ যাদের দান ও সহযোগিতায় ধর্ম-কর্ম, শিক্ষা-দীক্ষা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান এবং গণমানুষের সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দ্বীনের সঠিক পথ প্রদর্শনের কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে পরিচালিত হচ্ছে আল্লাহ তাদের সকলকে দুনিয়া এবং আখেরাতের কল্যাণ দান করুন -আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.