Home / মসজিদ / হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ, সেকাল-একাল

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ, সেকাল-একাল

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদটি আয়তনে বিশাল। এক সময়ে পাক-ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এবং পবিত্র ‘জুময়াতুল বিদা’ নামাজের জামাত আয়োজনের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাত ছিল। নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবেও মসজিদটি অনন্য। নির্মাণকাল থেকে এযাবৎ নানা ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর স্মৃতির সাথে বিজড়িত হয়ে আছে এ মসজিদ। মসজিদটির উদ্বোধনে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ শেরে বাংলার মন্ত্রীসভার আরও তিনজন মন্ত্রী মসজিদের উদ্বোধনী দিনে জুমার জামাতে শরীক হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এ মসজিদে নামাজ আদায় করতে এসেছিলেন হযরত মওলানা আব্দুল হামীদ খান ভাসানী এবং বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ।

ঐতিহাসিক এ মসজিদ প্রতিষ্ঠায় আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র অবদান অবিস্মরণীয়। এ মসজিদ এবং মসজিদ সন্নিবেশিত মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অর্থ-সম্পদ আর তাঁর সারা জীবনের অর্জিত সম্পদের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার সাথে তাঁর পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় সাধনার ধারাবাহিকতাও বিজড়িত হয়ে আছে।
আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র পূর্বপুরুষ হাজী মকিমউদ্দিন (রহ.) বাংলা দ্বাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পবিত্র আরব ভূমি থেকে সপরিবারে এ অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের বর্তমান অংশটি সে সময় নীচু জলাভূমির মাঝে একটি দ্বীপাকৃতি ভূখন্ড ছিল। ডাকাতিয়া নদীর উত্তরে অবিস্থত হাজা-মজা ডোবা-পুকুরের বিস্তীর্ণ এলাকার মাঝের সেই দ্বীপাকৃতি জায়গায় হাজী মকিমউদ্দিন (রহ.) আস্তানা স্থাপন করেছিলেন।
কয়েক বছরের মধ্যে এ অলীয়ে কামেলের ইসলামের দাওয়াত আশে পাশের অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল। দূর-দূরান্ত থেকে গুটিকতেক মুসলমান তার নিকট আসতে শুরু করে। এছাড়া অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও তার নিকট আসত এবং তার পবিত্র হাতে বায়াত গ্রহণের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত। পীর মকিমউদ্দিন (রহ.)’র ধর্মীয় সদালাপ ও মধুর ব্যবহারে সকলে মুগ্ধ হত।
ইহলোক ত্যাগের পর হযরত মকিমউদ্দিন (রহ.)কে তাঁর নিজ আস্তানায়, বর্তমান বড় মসজিদের পশ্চিমে মেহরাবের ডান দিকের পশ্চিম অংশে, সমাহিত করা হয়। হযরত মকিমউদ্দিন (রহ.)’র প্রভাব এবং তার প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব জনমনে এমনি গভীর রেখাপাত করেছিল যে, হিন্দুপ্রধান এই জনপদটি তাঁর নামানুসারে ‘মকিমাবাদ’ নামে পরিচিত লাভ করে। এভাবেই পর্যায়ক্রমে গড়ে উঠে মকিমাবাদ গ্রাম।
হযরত মকিমউদ্দিন (রহ.)’র বংশের পরবর্তী প্রজন্মের পুরুষ ছিলেন হাজী মুতিউদ্দিন। হাজী মুতিউদ্দিনের পুত্র ছিলেন হাজী মনিরউদ্দিন ওরফে মনাই হাজী। মনাই হাজীর আমল পর্যন্ত তাদের পূর্বপুরুষদের খানকা শরীফের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। আশপাশ থেকে আগত ভক্ত ও মুরিদগণকে সেই খানকায় তরবিয়ত ও ছবক প্রদান করা হত।
মনাই হাজী (রহ.) সুন্নতে রাসুল (সা.)’র নীতি অনুসরণপূর্বক ব্যবসা শুরু করেন। তিনি আস্তানা এলাকায় দক্ষিণ-পূর্ব অংশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি দোকান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিজ ব্যবসায়ের পাশাপাশি তিনি এই এলাকায় মুসলমান ব্যবসায়ী গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাজী দোকানের সুখ্যাতি লোকমুখে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে তিনি বর্তমান হাজীগঞ্জ মাছ বাজারে আরও একটি দোকান স্থাপন করেন। হাজী সাহেবের উৎসাহে সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু দোকান-পাট গড়ে উঠেছিল। হযরত মনাই হাজী (রহ.)’র মৃত্যুর পর তাঁকে বর্তমান মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ কবরস্থানের পূর্বাংশে সমাহিত করা হয়।
মনাই হাজী (রহ.)’র প্রতিষ্ঠিত হাজী দোকানকে কেন্দ্র করে সেখানে কালের পরিক্রমায় অত্র অঞ্চলের কেন্দ্রীয় বাজার গড়ে উঠতে থাকে। প্রথমে পবিত্র জুময়াকে কেন্দ্র করে প্রতি শুক্রবার বাজার বসত। অতঃপর শুক্র ও সোমবার বাজার বসা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দিনে সকালে ‘হাট’ বসত। সেই থেকে এখন পর্যন্ত শুক্র ও সোমবার সাপ্তাহিক বাজার বসে। অতপর এলাকার চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিদিনের সকালের হাট প্রতিদিনের বাজারে পরিনত হয়। এভাবে হাজীগঞ্জ পর্যায়ক্রমে অত্র অঞ্চলের কেন্দ্রীয় বাজারে পরিণত হয়।
মনাই হাজী (রহ.)’র দোকানের উছিলা ও সুখ্যাতিতে ‘হাজী সাহেবের দোকান’টি ‘হাজী দোকান’ নামে খ্যাত হয়ে উঠেছিল। সেই দোকানকে ঘিরে হাট বসতে শুরু করলে জায়গাটি ‘হাজীর হাট’ নামে পরিচিতি পায়। পরে বাজার সম্প্রসারিত হয়। লোকে এটাকে ‘হাজীর বাজার’ বলতে শুরু করে। এভাবে এক পর্যায়ে হাজীরবাজার থেকে ‘হাজীগঞ্জ বাজার’ হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করে এবং পর্যায়ক্রমে কলিকাতা বন্দরের সাথে যোগাযোগ সমৃদ্ধ হয়ে উঠে।
মনাই হাজী (রহঃ)’র কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তাই তাঁর ইহলোক ত্যাগের পর ভক্তগণ তাদের এবাদতের স্থান, হাজী সাহেবের মুদি দোকান ও সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য সকলের শ্রদ্ধেয় আহছান উল্লাহ পাটওয়ারীকে দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করেন। তিনি ছিলেন কাজিরগাঁও নিবাসী এক ধনাঢ্য মুসলিম পরিবারের সুযোগ্য উত্তরসূরী ও বিশিষ্ট আলেম।
আহছান উল্লাহ পাটওয়ারী বিপতœীক ছিলেন। তাকওয়া, পরহেজগারী ও ন¤্র স্বভাবের কারণে তিনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্রও ছিলেন। তাই সকলের পরামর্শে হাজী সাহেবের স্ত্রী তার একমাত্র কন্যাকে আহছান উল্লাহ পাটওয়ারী সাহেবের সাথে বিবাহ দেন। ফলে আহছান উল্লাহ পাটওয়ারী মনাই হাজীর (রহঃ)’র কন্যা ফজর বানুর সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন।
¬আহছান উল্লাহ পাটওয়ারীর ও ফজর বানুর ঘরে এক কন্যা সন্তান খাদিজা বানু ও এক পুত্র সন্তান আহমাদ আলী পাটওয়ারী জন্মগ্রহণ করে।
আহছান উল্লাহ পাটওয়ারী তুলনামূলক অল্প বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁকে বর্তমান মসজিদের দক্ষিণ দিকের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পর স্ত্রী ফজর বানুও তাঁর অনুগামী হন। আহমাদ আলী পাটওয়ারী তখন কিশোর। পিতা-মাতার অবর্তমানে বংশীয় সকল উত্তরাধিকারের ভার তার কাঁধেই এসে পড়ে। এ উত্তরাধিকার ছিল ধর্মীয় সাধনা ও ইসলামের আবাদের উত্তরাধিকার এবং বংশীয় সকল বিষয়-সম্পতি তদারকির উত্তরাধিকার।
উত্তরাধিকার হিসেবে আসা সুকঠিন এসব ভারবহনে নুয়ে পড়েননি আহমাদ আলী পাটওয়ারী। প্রথমদিকে তার ভগ্নিপতি আফছার উদ্দিন মিয়াজী নাছিরপুর থেকে সপরিবারে হাজী বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি শশুরালয়ের দায়িত্ব পালন ও তত্ত্বাবধানে আহমাদ আলীকে সহযোগিতা করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু এভাবে কিছু সময় দায়িত্ব পালনের পর আহমাদ আলীকে তার যথেষ্ট দক্ষ মনে হয়েছিল। তাই তিনি আহমাদ আলীর উপর সকল দায়িত্ব অর্পণ করে সপরিবারে আবার নাছিরপুর চলে যান।
বয়সের তুলনায় আহমাদ আলী পাটওয়ারী বেশ উঁচু, লম্বা ও সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। এছাড়া তিনি জোড়ালো মনোবল এবং অত্যন্ত মেধাশক্তিরও অধিকারী ছিলেন। তিনি উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত বিপুল বৈষয়িক সম্পদ-সম্পত্তি ও ধর্মীয় বিষয়াদি দেখাশুনা শুরু করলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জমি-জমা পরিচালনার পাশাপাশি এক সুবিশাল মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন।
বাংলা চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তার নির্মিত একচালা খড়ের মসজিদের সম্মুখে অবস্থিত বড় আকারের একটি পুকুর ভরাটের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এরই মধ্যে তিনি খড়ের পরিবর্তে টিন দিয়ে দো’চালা মসজিদ নির্মাণ করেন।
কিন্তু মসজিদের নির্মাণ কাজের ভাঙ্গা-গড়াসহ উন্নতি দেখে কতিপয় লোকের মাঝে ইর্ষার জন্ম নেয়। অল্পবয়সী একজন সাধারণ মানুষকে এতবড় মসজিদ নির্মাণ করতে দেখে শয়তানের প্ররোচনায় অনেকে কুৎসা রটনা করতে থাকেন। ইর্ষান্বিত ব্যক্তিরা নানা সমালোচনায়ও তৎপর হয়ে উঠেছিলেন।
এসব কুৎসা ও সমালোচনার মধ্যে আহমাদ আলী এক সময় এক বুজুর্গ ব্যক্তির শরণাপন্ন হলেন। তখন কলিকাতা মাদ্রাসায়ে আলীয়ার প্রধান মাওলানা ছিলেন শামছুল ওলামা ছফিউল্লাহ ওরফে মোল্লা সাহেব (রহ.)। তিনি গাউছ তরিকার অলী ছিলেন। হাজিগঞ্জের সে সময়ের সার্কেল অফিসার ছাইফুদ্দিন সাহেবের সাথে আহমাদ আলী কলিকাতায় গিয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়ে মসজিদ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পরামর্শ ও দোয়া নিলেন।
কলিকাতা থেকে ফিরে এসে তিনি মনে ভীষণ জোর পেলেন। বিপুল উৎসাহে পুনরায় মসজিদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ করলেন। এবার নির্মাণকাজে তার সঙ্গে অনেক লোক ঝুঁকে পড়ল। তার আহ্বানে অনেকে নিজের খরচে নৌকা ভরে মাটি এনে পুকুর ভরাটে সহায়তা করতে আরম্ভ করল। রাত্রেও হেজাগ লাইট জ¦ালিয়ে কাজ চলতে লাগল।
পূর্বপুরুষের খানকাশরীফ এবং পীর-মুরীদি কার্যক্রমকে প্রাধান্য না দিয়ে আহমাদ আলী মসজিদ প্রতিষ্ঠায় বেশী গুরুত্ব প্রদান করলেন। মাজারকে উপলক্ষ করে মানুষ যেন র্শিক-বিদাত কার্যক্রমের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, ছোটবেলা থেকে তিনি এমন মনোভাবাপন্ন ছিলেন। তাই পূর্বপুরুষের সমাধিস্থান সমূহের প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেননি। মসজিদ প্রতিষ্ঠার দিকেই তিনি একাগ্র চিত্তে মনোনিবেশ করলেন। তবে তিনি পীর-মুরিদি বা তরিকত বিদ্বেষী ছিলেন না। পরবর্তী সময়ে তিনি হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)’র পবিত্র হাতে বায়াত গ্রহণ করে নিয়মিত তরিকতের সাধনা করেছিলেন।
ইতিমধ্যে আহমাদ আলীর ব্যবসা-বাণিজ্যেও যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল। জুময়ার দিনে দূর-দূরান্ত থেকে মুসলমানগণ নামাজে শরীক হতে মসজিদে আসতেন। জুময়াকে উপলক্ষ করে বাজারে কেনা-বেচাও বেশি হত। এতে করে জুময়ার দিনই বাজারের দিন হিসেবে পরিগণিত হতে লাগল।
মনাই হাজী (রহ.)’র ব্যবসায়ীক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের ধারায় আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) বিভিন্নমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সে সময় অত্র এলাকায় বাঁশ, খড় ও গোলপাতা দিয়ে মানুষ ঘর-বাড়ি তৈরি করত। কাঠ ও টিন দিয়ে ঘর তৈরি করা ছিল আভিজাত্যের বিষয়। তিনিই ছিলেন হাজীগঞ্জ বাজারের প্রথম কাঠ ব্যবসায়ী এবং বার্মা থেকে আমদানিকৃত কাঠের আড়ৎদার। বার্মা থেকে আমদানিকৃত কেরোসিন তেলের প্রথম এজেন্সি, তাঁর স্থাপিত মোমবাতি ফ্যাক্টরি, জেনারেটরের বিরাট ইঞ্জিন বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা, সাবান ফ্যাক্টরি, পরবর্তীতে ধান ছাটাইয়ের কল স্থাপন প্রভৃতি অত্যাধুনিক কর্মকূশলতা অত্র এলাকায় জনমনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। এছাড়াও তিনি অনেক নতুন নতুন কর্মের উদ্যোক্তা ছিলেন।
ব্যবসায় প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি তিনি নতুন উদ্দীপনায় আরও দ্রুত গতিতে মসজিদের নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। যুবক বয়সেই তিনি হজ্বব্রত পালন করেন। তিনি ৩ বার হজ¦ ব্রত পালন করেন। এর মধ্যে ২ বার পবিত্র আকবরী হজ¦ লাভ করেন। হজ্ব করে আসার পর থেকে বিভিন্ন এলাকার মানুষ মসজিদের প্রতি আরও আন্তরিক হয়ে উঠলেন। তাদের বিপদ-আপদ থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং জাগতিক উন্নতির আশায়ও অনেকে মসজিদে বেশী বেশী দান-খয়রাত করতে শুরু করলেন। তারা মসজিদের নামে গাছের ফল ফলাদি, মাঠের ফসল, পশু-পাখি এমন কি পর্যাপ্ত পরিমানে দুধ-ডিম পর্যন্ত নিয়ত-মানত করতে লাগলেন এবং তাদের বর্ণনায় সেগুলোর ভালো ফলও পেতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
মসজিদ নির্মাণে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদানে যারা এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে ফরিদগঞ্জ নিবাসী আমজাদ আলী পাটওয়ারী, রামচন্দ্রপুর নিবাসী আব্দুল পাটওয়ারী, মতলব নিবাসী মাহমুদ রাজা, মনিনাগ নিবাসী কাশেম আলী মজুমদার ও করিম উদ্দিন মজুমদার উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তিবৃন্দের মধ্যে জুনাব আলী মজুমদার (প্রাক্তন এম.এল.এ.), আব্দুল আজিজ চৌধুরী, খান সাহেব আমিন মিয়া, খান সাহেব জুনাব আলী মুন্সি, আলহাজ্ব আব্দুল হামিদ মুন্সি এবং মোঃ ওয়াহাব আলী বেপারী সাহেব প্রমুখ। তারাও মসজিদ প্রষ্ঠিার কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানা সহযোগিতা করেছিলেন।
হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ প্রতিষ্ঠা
আহমাদ আলী পাটওয়ারী আল্লাহ্পাকের উপর ভরসা করে পবিত্র হজ্ব পালন শেষে দেশে ফিরেই পাকা মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। হাজী মকিমউদ্দিন (রহ.)’র আস্তানার অংশসহ দক্ষিণ দিকে ১৫০ী৩০ ফুট আয়তনের পাকা মসজিদ নির্মাণের কাজে হাত দিলেন। সে সময় এ এলাকায় ব্রিকফিল্ড ছিল না। তিনি ইটের জন্য নিজেই ইটভাটা তৈরি করলেন।
পাকা মসজিদ নির্মাণকাজের জন্য ঢাকার সুনিপুণ ওস্তাগার আব্দুর রহমান রাজকে হাজীগঞ্জে নিয়ে আসলেন। বাংলা ১৩৩৭ সালের ১৭ আশ্বিন ও ইংরেজি ১৯৩০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। মসজিদের প্রাচীর তৈরির কাজ সমাপ্ত হলে আহমাদ আলী নিজে কলিকাতা গিয়ে জাহাজ ভাড়া করে ছাদের জন্য লোহার বীম ও মেঝের জন্য মর্মর পাথর নিয়ে ডাকাতিয়া নদী বেয়ে হাজীগঞ্জে এসেছিলেন। নির্মাণকাজে আব্দুর রহমান রাজের নেতৃত্বে সাত বছর সময়ের মধ্যে মূল মসজিদদালান সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেল। বাংলা ১৩৪৪ সালের ১০ই অগ্রহায়ন ও ইংরেজি ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর, রোজ শুক্রবার নবনির্মিত মসজিদ উদ্বোধনের আয়োজন করা হলো।
মূল মসজিদের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হলে আব্দুুর রহমান ওস্তাগার মসজিদের মেহরাব সাজানোর কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি পছন্দ মত কাচের টুকরো ভেঙ্গে মেহরাবে ফুল, ঝাড় ইত্যাদি মনোরম নকশা ফুটিয়ে তুলতে লাগলেন। তার শৈল্পিক চেতনার পূর্ণশক্তি কাজে লাগিয়ে তিনি হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের মেহরাবে এক অতুলনীয় শিল্পনৈপুণ্যের স্বাক্ষর এঁকে দিলেন। তার নিপুণ হাতের কারুকার্যে তৈরি হয়ে গেল হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের দৃষ্টিনন্দন মেহরাব।
মেহরাবসহ মূল মসজিদের নির্মাণকাজ সর্বাঙ্গিন সুন্দরভাবে স¤পন্ন হলে হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী এবার ভরাট করা পুকুরভিটির উপরে মসজিদের দালান বারান্দা নির্মাণ করার পরিকল্পনা করলেন। তিনি বাগদাদ ভ্রমনের সময় খুঁটির উপর নির্মিত মসজিদ দেখেছিলেন। ভরাট পুকুরভিটির উপর দালানবারান্দা নির্মাণের সময় তিনি সে নমুনা অনুসারে দালান নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের এ বিশাল ইমারত নির্মাাণ কাজে তার কোনো প্রকৌশলীর পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ হয়নি। পুরোটাই ছিল তাঁর নিজস্ব চিন্তার ফসল আর নিপুণ শিল্পী আব্দুর রহমান ওস্তাগারের সহযোগিতা। বাগদাদে খুঁটির উপর নির্মিত মসজিদের নির্মাণকৌশল তিনি ভালোভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। অভিজ্ঞ ওস্তাগার আব্দুর রহমানকে তিনি তা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এবং সে অনুপাতে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জুময়ার সানি আজানের জন্য মসজিদের ভিতরে সেগুন কাঠ দ্বারা অতি চমৎকার নকশা সম্বলিত আকর্ষণীয় একটি মাঁচাও তৈরি করেছিলেন।
হাজী আহমাদ আলী ছিলেন মনাই হাজী (রহ.)’র একমাত্র মেয়ের একমাত্র পুত্র। মাতুলসূত্রে তিনি মনাই হাজী (রহ.)’র সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ও দখলদার ছিলেন। তিনি মসজিদের জন্য সম্পত্তি ওয়াক্ফ করেন কবরস্থানের সম্পত্তি ওয়াক্ফ করলে শরিয়তের বিধান মোতাবেক সেই স্থান নগদ মূল্যে ক্রয় করে দাফন করতে হয়। তাই তিনি মসজিদের দক্ষিণ পাশর্^ এবং তার পাশর্^বর্তী বাগানসহ কবরস্থানের জায়গা ওয়াক্ফের বাইরে রেখেছিলেন।
উল্লেখিত ওয়াক্ফ সম্পত্তি বঙ্গীয় ওয়াক্ফ কমিশনার অফিসে ‘আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াক্ফ এস্টেটে’র আওতাধীন তালিকাভূক্ত রয়েছে।
মূল মসজিদের সম্মুখভাগে ভরাটকৃত পুকুরের উপর মসজিদের বারান্দা বা বর্ধিত অংশের ১৫০ী৯৩ ফুট পরিধির জন্য ৭৭ টি পিলার নির্মিত হলেছিল। আব্দুর রহমান ওস্তাগার সম্মুখভাগের পিলারগুলির সামনের দিকে অতি চমৎকার কারুকার্য তৈরি করে তার শৈল্পিক নিপুণতার স্বাক্ষর রেখে যান।
মসজিদের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশ নির্মাণের পর তৃতীয় অংশ নির্মিত হয়। তৃতীয় অংশের আয়তন ছিল ১৫০ী৪৮ ফুট। এভাবে তিন ধাপে নির্মিত তিনটি অংশ মিলে মোট ১৫০ী২১৬ ফুট বিশিষ্ট বিশাল এক মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হলো।
মসজিদের ওয়াকিফ ও মোতাওয়াল্লী হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী মসজিদ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। মসজিদের পূর্বপাশের নি¤œভূমির উত্তর অংশ ভরাট করে ১৯৩১ সালে তিনি সেখানে হাজীগঞ্জ দারুল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসা গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি ১৯৫৩ সালে মসজিদের পূর্ব সীমানায় প্রধান দরজায় ১২২ ফুট উঁচু মিনার তৈরির কাজ শুরু করেন এবং মিনারের পাশে গম্বুজ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন। পরিকল্পনা মোতাবেক মিনার তৈরির কাজে আর্থিক সংকট পরিলক্ষিত হলে তিনি আবারও কাজিরগাঁও মৌজাস্থ তাঁর নিজ মালিকানাধীন ছয় কানি সম্পত্তি বিক্রয় করে সেই অর্থ মিনার তৈরির কাজে লাগান। মিনারার দু’পাশে দু’টি সিঁড়িসহ সুউচ্চ মিনার তৈরি করা হয় এবং মিনারের উপরে ফানুসের মত একটি টপ নির্মাণ করা হয়। ১৯৫৭ সালের শুরুর দিকে মিনার তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল।
মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজের জন্য কলিকাতা থেকে বিভিন্ন রঙের ফুলের ঝুরি, টব ও রঙিন কাচ ক্রয় করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া চট্টগ্রামের চীনা বাসনপত্রের ব্যবসায়ীগণ প্রধান ফটক ও গম্বজের কাজের জন্য তাদের ভাঙা চীনা বাসন বস্তাবন্দি করে রেল ওয়াগনে করে বড় মসজিদের নকশার কাজের জন্য নিজ খরচে হাজীগঞ্জে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
মিনারের নীচে মসজিদের পূর্বদিকের প্রধান দরজায় চিনা বাসন দ্বারা অতি মনোরম নকশা তৈরি করা হয়। নকশায় মনোরম জ্যোৎ¯œা উৎকীর্ণ করা হয় এবং সেখানে নামাজ ও মসজিদ বিষয়ক বিশেষ হাদিস সংযোজিত হয়েছে। এভাবে আহমাদ আলী পাটওয়ারী ২৮৪০৫ বর্গফুট আয়তনের বিশাল মসজিদ নির্মাণ সুসম্পন্ন করেছিলেন।
মসজিদের স্থায়ী আয়ের উৎস সৃষ্টি করার লক্ষ্যে তিনি তার বাজারের সম্পত্তির উপর ভাড়াটিয়া বসান। তিনি মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি মসজিদ পরিচালনার জন্য অফিসগৃহও নির্মাণ করেন। এছাড়া দূরের জিয়ারতকারী বা মেহমানদের সান্ধ্যকালীন বিশ্রাম বা রাত্রিযাপনের জন্য একটি মুসাফিরখানার ব্যবস্থা করেন। এজন্য তিনি আমদানিকৃত শাল কাঠের তক্তা ও খুঁটি দিয়ে মসজিদের দক্ষিণপূর্ব কোণে দরজার পূর্বপাশে হুজরা কাম মুসাফিরখানা বা মেহমানখানা পুননির্মাণ করেন।
হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র মেহমানদারীর জুড়ি ছিল না। তাঁর নির্মিত মুসাফিরখানা বা মেহমানখানা মসজিদের মেহমান ছাড়াও সে সময় অত্র এলাকার উচ্চ পদস্থ অফিসারগণ মেহমান হিসেবে আসতেন। তারা অধিকাংশই ওনার মেহমান হিসেবে অতিথেয়তা গ্রহণ করতেন। তারা তখন বর্তমান থানা এবং পোস্ট অফিসের পূর্বে অবস্থিত কাঠ এবং গোলপাতা দিয়ে তৈরি ডাক বাংলায় অবস্থান করতেন। আহমাদ আলী পাটওয়ারী নিজ পুকুরে বড় বড় মাছের চাষ করতেন।
বিভিন্ন মানুষ দোয়ার জন্য মানত হিসেবে বড় মসজিদে দুধ পাঠাতো। এভাবে তিনি পর্যাপ্ত পরিমান দুধ পেতেন। সেই দুধ দিয়ে ওনার স্ত্রী ফিরনি, পায়েস এবং বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি বানাতেন। এসব উপকরণ দিয়ে তিনি হাজীগঞ্জে আগত মেহমানদের মেহমানদারী করতেন। তিনি নিজেও খাওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত সৌখিন ছিলেন। নিজে বাজারে গিয়ে বাজার করতে পছন্দ করতেন। বড় বড় মাছের কোল, দুধ, ডিম, ঘি ছিল তার খাদ্য তালিকার নিয়মিত উপকরণ। তিনি ভাতের সাথে ঘি খেতেন ডালের মত। এক সাথে ৫/৭ টি করে ডিম খেতেন। তাঁর শরীর উঁচ,ু লম্বা এবং বড় মাপের ছিল। তিনি দিন রাত যেমন পরিশ্রম করতেন, তেমন খাবারও খেতেন। নিজে খেতেন এবং অন্যদের মেহমানদারীতেও আনন্দবোধ করতেন। আর সব সময় বলতেন, ‘রিজিকের মালিক রাজ্জাক’। আল্লাহ্র উপর ছিল তার অগাধ বিশ^াস। এ বিশ^াসই তাঁর জীবনকে স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করিয়েছে।
হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী মুসলমান বালক-বালিকাদের জন্য একটি একতলা মাদ্রাসাতুল কোরআন প্রতিষ্ঠা করে সেটিও রেজিস্ট্রি দলিলমূলে ওয়াক্ফ করে দেন। মোতাওয়াল্লী হিসেবে তার যে সম্মানী ভাতা ধার্য ছিল সেই তহবিলের জমানো দশ হাজার টাকা তিনি ইহজগত ত্যাগের কিছুদিন পূর্বে ফোরকানীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করেন। বাংলা ১৩৭৫ সালের ১৭ই বৈশাখ ও ইংরেজি ১৯৬৮ সালের ৩০ এপ্রিল সকাল ৮ টা ৪৫ মিনিটে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুর পর তার নির্মিত মসজিদের দক্ষিণ পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। প্রতিদিন অনেক মরমী ব্যক্তি তাঁর কবর জিয়ারত করে থাকেন এবং তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।
হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের ওয়াকিফ ও মোতাওয়াল্লী হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আল্লাহভীরু, নিবেদিতপ্রাণ ও অক্লান্ত এক কর্মবীর। ব্যক্তিগত জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তেমন সুযোগ না পেলেও প্রকৃতগতভাবে তিনি ছিলেন তীক্ষèবুদ্ধির অধিকারী ও উদারপ্রাণ দ্বীনদার আল্লাহভীরু মানুষ। তিনি ছিলেন চিন্তাশীল, দূরদর্শী ও স্বল্পভাষী। তিনি সহি শুদ্ধ রূপে নিয়মিত পবিত্র কালামে পাক তেলওয়াত করতেন। তাঁর পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল অতি সাধারণ। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা সকল ঋতুতে তিনি তাহাজ্জতের সময় মসজিদে আসতেন এবং নিয়মিত মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতেন।
তিনি বিশাল সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্বেও বিলাসিতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর একমাত্র চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা ছিল স্বপ্নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অর্থাৎ মসজিদ সাজানো আর মুসল্লিদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করা। তিনি শীতের মৌসুমে মুসল্লিদের অযুর জন্য গরম পানির ব্যবস্থা করেছিলেন। সে সময় এতদঞ্চলে বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জেনারেটরের সাহায্যে মসজিদে আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। সুদূর আরব দেশ হতে সাইরেন এনে রমজান মাসে সেহ্রী ও ইফতারের সময় সাইরেন বাজানোর ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। মফস্বলের এ মসজিদে তিনি দেশের সবচেয়ে উচু মিনার তৈরি করেছিলেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং নিজ অর্জিত প্রায় সকল সম্পত্তি মসজিদের কল্যাণে উৎসর্গ করেন। মাত্র ৩২ বৎসর সময় অর্থাৎ তিন দশকের নিবিড় কর্মতৎপরতায় এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মেহরাব থেকে মিনার পর্যন্ত গড়ে তুলেছিলেন।
বড় মসজিদের প্রসিদ্ধি
আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র প্রতিষ্ঠিত বিরল কারুকার্যখচিত হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদটি তার জীবদ্দশাতেই উপমহাদেশে ‘জুমাতুল বিদা’ নামাজের বৃহত্তম জামাতের স্থান হিসেবে খ্যাত হয়ে ওঠেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখনও প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ ‘জুময়া’র নামাজ উপলক্ষে বৃহত্তম জুময়ার জামাতে শরীক হওয়ার জন্য অসংখ্য মুসল্লি সমবেত হয়। ‘জুমাতুল বিদা’র দিন মসজিদের ছাদ, সামনের মাঠ, বহুতল মাদ্রাসা ও মার্কেটসমূহের বিভিন্ন ফ্লোর, বাজারস্থ দোকানঘর ও দালানের ছাদসমূহ, এমনকি সিএন্ডবি রাস্তাসহকারে সারা হাজীগঞ্জ বাজার নামাজের স্থানে মসজিদ রূপে পরিগণিত হয়।
তাছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় দিবসসমূহের ইবাদতেও বিপুল সংখ্যক মুসল্লি সমবেত হন। প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পবিত্র মিলাদুন্নবী (সাঃ) মাহফিলসহ ধর্মীয় আরও অনেক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। তখন হাজার হাজার মুসল্লির সমাবেশে দেশ বরেণ্য ও প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম এবং মুফাস্সীরে কেরাম ওয়াজ নসিহত করে থাকেন।
অতীতে এ মসজিদকে কেন্দ্র করে কিছু সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচীও গৃহিত হয়েছিল। পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর শরীয়াভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ প্রাঙ্গণে এক বিরাট ইসলামী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রূপসার জমিদার জনাব সৈয়দ আবদার রশিদ এ সম্মেলন আয়োজনকারী কমিটির সভাপতি ছিলেন। সম্পাদকের দায়িত¦ পালন করেছিলেন খান সাহেব আমিন মিয়া। মূল সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন আল্লামা হাকীম আব্দুর রউফ দানাপুরী। বিভিন্ন শাখার সভাপতি ছিলেন মওলানা জাফর আহমাদ ওসমানী থানভী, মওলানা আব্দুল হাই কোরাইশী ছারছীনা এবং মওলানা আবু জাফর ছিদ্দিকী আল-কোরাইশী ফুরফুরা শরীফ।
এ সম্মেলন উপলক্ষে পাক ভারতের খ্যতনামা ওলামায়ে কেরাম হাজীগঞ্জ বড় মসজিদে আগমন করেছিলেন। সম্মেলন তিন দিন ব্যাপী স্থায়ী হয়েছিল। সভাপতি আল্লামা হাকিম আব্দুর রউফ দানাপুরীর সুদীর্ঘ ভাষণের অনুলীপি কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময় বড় মসজিদের ইমাম হাফেজ মওলানা সামছুল হুদা স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। সে কারণে পাক বাহিনীর ৩০ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের হাবিলদার বশিরের মাধ্যমে আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র বংশধরগণের ১১ জনকে থানায় আটক করা হয়েছিল এবং পূর্বে বরখাস্তকৃত ইমাম আবু নছর মোহাম্মদ আবেদ শাহকে পুনরায় ইমাম পদে নিয়োগ করতে মোতাওয়াল্লী মনিরুজ্জামান সাহেবকে বাধ্য করা হয়েছিল।
বড় মসজিদের মেহমানখানায় বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের অনেক স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অবস্থান করেছেন। বিভিন্ন সময়ে মসজিদের মেহমানখানায় আগমনকারীদের মধ্যে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর, মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সততার অনন্য প্রতীক, নিরলস কর্মবীর ও নিবেদিতপ্রাণ ওয়াকিফ ও মোতওয়াল্লী হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র কর্মকুশলতায় উপমহাদেশের অনন্য মকবুলিয়াত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদখানা অগণিত আল্লাহ্ভীরু মানুষের ইবাদত, সেজদা ও অবদানের ঐতিহ্য নিয়ে সগৌরবে সুউচ্চ মিনার ও গম্বুজসহকারে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক এ মসজিদের পাশে এক মুখরিত পরিবেশে চালু রয়েছে আলিয়া মাদ্রাসা, হাফেজিয়া মাদ্রাসা, নূরানী মাদ্রাসা, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং ইসলামিয়া পাঠাগার। এছাড়া এখানে চালু রয়েছে দুস্থ ও অসহায়দের সহযোগিতা প্রদানসহ ধর্মীয় নানা কার্যাবলী।
মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী
আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ইহলোক ত্যাগের পূর্বে তাঁর তৃতীয় পুত্র মোঃ মনিরুজ্জামান পাটওয়ারীর উপর মোতাওয়াল্লী পদের দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর পিতার পরামর্শ মোতাবেক তিনি মসজিদের তৃতীয় অংশে দোতলা ও গম্বুজ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যান। এছাড়া তিনি ভাড়াঘরসমূহের উন্নয়নের কাজেও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মসজিদ কমপ্লেক্সের অধিকাংশ দোকানঘর খড় দ্বারা নির্মিত ছিল। তিনি সেগুলোর স্থানে পাকা দোকানঘর নির্মাণ করেছিলেন। তিনি নামাজের অযুর পানির জন্য চাপ কলের পাশাপাশি পাম্প মেশিনের সাহায্যে ট্যাংকিতে পানি জমা করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ সুনিশ্চিত করেছিলেন। এছাড়া তিনি মসজিদের ইমাম সাহেবের বাসা ও হেফজখানা দোতলা করেছিলেন এবং মহিলা জিয়ারতকারীগণের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। মসজিদের তৃতীয় অংশের দো’তলা ছাদের নির্মাণ ব্যতীত গম্বুজসহ মসজিদের দোতলার ৩য় অংশের অধিকাংশ কাজ তার আমলেই শেষ হয়েছিল। তিনি মসজিদের দক্ষিণ পাশে সিএন্ডবি রাস্তার পাশে মসজিদে প্রবেশের প্রধান রাস্তায় আকর্ষণীয় শাহী গেট নির্মাণ করেন।
মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী তার ব্যবসায়ীক কার্যক্রমের পাশাপাশি মসজিদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক জুলুম এবং মানষিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এসবের মধ্যেও একাগ্রচিত্তে তার দায়িত্ব পালনে তিনি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। ছোটবেলা থেকে ব্যবসা বাণিজ্যে তার প্রবল আগ্রহ ছিল। আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) তার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে ধরে রাখার লক্ষ্যে তাকে মোতাওয়াল্লী পদে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী বিভিন্ন পণ্যের সিজনওয়ারী স্টক ব্যবসা করতেন। এছাড়াও রাইস মিল, আটার মিল, সরিষার মিল, নাবিস্কো বিস্কুটের এজেন্সি, বেবী-টেক্সি ও ট্রান্সপোর্ট ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায় পরিচালনা করতেন। পিতার মত সততাই ছিল তার জীবনের আদর্শ। অনেক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ সময় তিনি হাসি মুখে কথা বলতেন। এস্টেট রক্ষা করতে গিয়ে শত অত্যাচার, নিপিড়ন ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তার জীবন কেটেছে। তিনি ডায়াবেটিস ও জ-িস রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং হাই প্রেসারে ভুগছিলেন। তিনি তাঁর পিতা আহমাদ আলী পাটওয়ারীর মত দীর্ঘজীবন লাভ করেননি। ১৯৮৫ ইং সালের ১৯ আগস্ট রোজ সোমবার দিবাগত রাত বার টার পূর্বে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না………………… রাজেউন)।
তাঁর মৃত্যুর আগেই তিনি তার বড় ছেলে মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারীকে মোতওয়াল্লী পদে দায়িত্ব প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালের ১৯ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর দিন সকালে তার বড় ছেলেকে সৌদি আরবে চাকুরি ছেড়ে জরুরি বাড়িতে আসার জন্য পত্র লিখেছিলেন। ওই দিনই তিনি পিতার পার্শ্বে কবরের জায়গাও নিজ হাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছিলেন। এছাড়া মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব শেষ করে তাঁর ভগ্নিপতি মাওলানা শামছুল হক এবং কেরানি আব্দুছ সাত্তারকে বুঝিয়ে দিয়ে তৃপ্তির হাসিতে হেসেছিলেন। এরপর এশার সময় জামাতে নামাজ আদায় করে তিনি বাড়িতে যান। স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ রাতের খাবার খান এবং ফল হিসেবে বাজার থেকে হাতে করে নিয়ে আসা আম কেটে সকলে মিলে খান। শুয়ে পড়ার পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রাতেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। পিতার সমাধির পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারী
পিতার অছিয়ত ও পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারীকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ‘আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াক্ফ এস্টেটে’র মোতাওয়াল্লী হিসাবে দায়িত গ্রহণ করতে হয়েছিল। শুরুতে তিনি মসজিদ এবং তার পাশাপাশি ধর্মীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
এভাবে মোতাওয়াল্লী হিসেবে কিছুকাল দায়িত্ব পালনের পর তিনি মসজিদের জন্য প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী কিছু সংস্কার কার্যক্রমের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি দারুল-উলুম সিনিয়র মাদ্রাসাকে আলীয়া মাদ্রাসায় উন্নীত করেন। এছাড়া হাফেজিয়া ও ফোরকানীয়া মাদ্রাসা, পিতার স্মৃতির স্মরণে মুনিরীয়া নূরানী মাদ্রাসা, এতিমখানা, মুসাফিরখানা, ইসলামী পাঠাগার ও গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং নি¤œভূমি ভরাটকরণসহ সংস্কার ও উন্নয়ন কাজে প্রায় ১০ (দশ) কোটি টাকার প্লান এস্টিমেট সম্বলিত এক বিরাট উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
মসজিদ সংস্কার: প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ আলী পাটওয়ারীর আমলে যে মসজিদ নির্মিত হয়েছিল তাতে মসজিদের দ্বিতীয় অংশে ৭৭টি পিলার ছিল। পরবর্তীতে মসজিদের সেই অংশ সংস্কারের প্রয়োজন হলে মোতাওয়াল্লী আলমগীর কবির পাটওয়ারী সেই অংশের ৭৭টি পিলার অপসারন করে ১৬টি পিলারের উপর পাঁচ তলা ফাউন্ডেশনবিশিষ্ট বর্তমান মসজিদের প্রথম এবং দ্বিতীয় অংশ পুননির্মান করে একীভূত করেন।
মাদ্রাসা সম্প্রসারণ: আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ১৯৩১ সালে যে দারুল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মোতাওয়াল্লী ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারীর আমলে ১৯৯৫ সালে সেটি কামিল পর্যায়ে উন্নীত হয় এবং সে বছরই মাদ্রসাটি এমপিওভূক্তি লাভ করে। ইতিপূর্বে ১৯৯০ সারে তার আমলেই মাদ্রাসাটিতে দাখিল ও আমিল শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে এখানে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে বালিকা শাখা চালু করা হয়। মাদ্রসাটিতে একটি কম্পিউটার ল্যাবও চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে ৩০০০ শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করছে। মাদ্রাসাটি শিক্ষার গুনগত মান ও ফলাফলের ভিত্তিতে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি লাভ করেছে। ভবিষ্যতে এখানে অন্যান্য বিভাগ ও শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
আহমাদ আলী পাওয়ারী (রহ.) ১৯৬৪ সালে যে ফোরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্তমান মোতাওয়াল্লীর উদ্যোগে ২০০১ সালে সেটি কাওমী নেসারের দ্বীনি মাদ্রাসা হিসেবে জামিয়া আহমাদিয়া কাওমী মাদ্রাসা নামে পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়। কাওমী মাদ্রাসার জন্য নিজস্ব বহুতল ভবনও তিনি নির্মাণ করেন।
এই কাওমী মাদ্রাসায় বর্তমানে নুরানী বিভাগ থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত প্রায় ১২০০ (এক হাজার দুইশত) শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভ করছে। আহমাদিয়া কাওমী মাদ্রসার আওতাধীন মাদ্রাসাসমূহ যথাক্রমে মুনিরিয়া নুরানী মাদ্রাসা, হাজী মনিরউদ্দিন (মনাই হাজী) হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও ইকরা বিভাগ।
মার্কেট সম্প্রসারণ: হাজীগঞ্জ একটি উপজেলা শহর হলেও বর্তমানে হাজীগঞ্জের কলেবর জেলাশহর চাঁদপুরের মত হতে যাচ্ছে। বাজারের পরিধি, বহুতল মার্কেট ও আবাসিক ভবন, শহরে জমির মূল্য আর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিবেচনায় হাজীগঞ্জ উপজেলা যেকোনো জেলা শহরের সাথে তুলনীয়। এলাকার মানুষ হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের বর্তমান মোতাওয়াল্লী ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারীকে হাজীগঞ্জের এই ব্যাপক রূপান্তরের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করে। তাঁকে আধুনিক হাজীগঞ্জের রূপকার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। হাজীগঞ্জে মসজিদ কম্পপ্লেক্সের জায়গায় সেই নব্বইয়ের দশকে তিনিই প্রথম বহুতল আবাসিক ভবন ও মার্কেট নির্মাণ করেছিলেন। ‘হাজীগঞ্জ প্লাজা’ নামের সেই মার্কেটে সে সময়ই সংযুক্ত করা হয়েছিল আধুনিক লিফ্ট ও চলমান সিঁড়ি।
এরপর মসজিদ কপপ্লেক্সের জায়গায় তিনি একের পর এক নির্মাণ করেছেন বহুতলবিশিষ্ট বেশ কয়েকটি মার্কেট। এ মার্কেটগুলোর মধ্যে রয়েছে কাওমী মাদ্রাসা মার্কেট, হাজীগঞ্জ টাওয়ার মার্কেট এবং রজনীগন্ধা মার্কেট। অতি সম্প্রতি ‘বিজনেস পার্ক মকিমউদ্দিন শপিং সেন্টার’ নামে ১২ তলা ফাউ-েশন নিয়ে একটি অত্যাধুনিক মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
বড় মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) মসজিদ পরিচালনার জন্য স্থায়ী আয়ের উদ্দেশ্যে কিছু দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছিলেন। তাঁর পুত্র পরবর্তী মোতাওয়াল্লী মনিরুজ্জামান পাটওয়ারীর প্রচেষ্টায় আরও কিছু পাকা দোকানঘর নির্মিত হয়েছিল। সেই দোকান ঘরগুলোর সম্পত্তির সাথে আরো কিছু সম্পত্তি ক্রয়পূর্বক যুক্ত করেছিলেন বর্তমান মোতাওয়াল্লী ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারী। আর সেই সম্পত্তিগুলোর উপর তিনি গড়ে তোলেন আধুনিক এসব বহুতল মার্কেট। এভাবে অতীতের জরাজীর্ণ দোকানঘরগুলোর পরিবর্তে মসজিদ কমপ্লেক্সের জায়গায় এসব আধুনিক স্থাপনা গড়ে ওঠেছে। এছাড়াও তিনি হাজিগঞ্জ পৌরসভা এলাকার মধ্যে বিগত তিন দশকে মসজিদ কমপ্লেক্সের নামে আরও কয়েক একর জমি ক্রয় করেছেন। এতে মসজিদ কমপ্লেক্সের আওতাধীন ভূসম্পত্তির পরিমান দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ আলী পাটওয়ারীর আমলের ভূসম্পত্তির প্রায় দ্বিগুন। আর মসজিদ কমপ্লেক্সের সার্বিক কার্যক্রম প্রসারিত হয়েছে প্রায় দশ গুন। আগামীতে মসজিদ কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে আরও নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠিত এই মার্কেটগুলোর কয়েক শত দোকানের ভাড়া থেকে মসজিদ পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ এবং মসজিদ কমপ্লেক্সের আওতাধীন ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় নির্বাহ করা হয়। মাকের্টগুলোতে শত শত পরিবারের নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এলাকার প্রায় কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সর্বপরি এই মার্কেগুলোকে কেন্দ্র করে এলাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে এলাকার মানুষও তাদের নিজ নিজ মালিকানাধীন জায়গাসমূহে এরকম বহুতল মার্কেট ও আবাসিক ভবন গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছেন। এভাবে আধুনিক বহুতল স্থাপনার দিক দিয়ে হাজীগঞ্জ এখন একটি জেলা শহরের সমান কলেবর লাভ করতে যাচ্ছে।

বর্তমানে আধুনিক হাজিগঞ্জ শহরে বড় মসজিদ কমপ্লেক্সটি সরকারিভাবে প্রাপ্ত দান-অনুদান ছাড়াই অভ্যন্তরীণ উৎসকে কাজে লাগিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ‘আহমাদ আলী ওয়াক্ফ এস্টেটে’র নিজস্ব সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসন ও সকল স্তরের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা আর দ্বীনদার মুসলমানগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে মসজিদ কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে হাজার হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ে সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতি বছর পবিত্র মিলাদুন্নবী (সা:), সীরাতুন্নবী (সা:), শবেমেরাজ, শবেবরাত, শবেক্বদর ও আশুরা উদ্যাপন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার করা হয়।

মসজিদ কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে আরও অনেক উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালত হচ্ছে। সেবামূলক কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে বয়স্কদের জন্য আলাদাভাবে কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা, মহিলাদের জন্য কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা, স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা; পবিত্র রমজান মাসের সেহ্রী ও ইফতারের ক্যালেন্ডার বিতরণ, সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ইফতারের ব্যবস্থা ও ইতিকাফকারীদের বিশেষ সেবাদানসহ রমজানের অন্যান্য ব্যবস্থাপনার আয়োজন। এছাড়া প্রতিবছর দুর্যোগ কবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের নতুন গৃহ নির্মাণে সহায়তা করা হয়। সবকিছু মিলে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ কমপ্লেক্সটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একটি ইসলামী শিক্ষা সম্প্রসারণ ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।

অতীতে এখানে কোনো শহর বা গঞ্জ তো দূরের কথা হাজীগঞ্জ নামটিরই কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এ অঞ্চলটি ছিল হিন্দু জনসাধারণ অধু্যুষিত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু বাড়িঘর সহকারে নিতান্ত সাধারণ একটি নি¤œাঞ্চল। আহমাদ আলী পাটওয়ারীর পূর্বপুরুষ পীর মকিমউদ্দিনের আগমন ও ইসলাম প্রচারের সুবাদে এ এলাকাটি মকিমাবাদ গ্রাম নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। হাজী মকিমউদ্দিনের পরবর্তীপুরুষ মনাই হাজীর ধর্মীয় কার্যক্রম আর তাঁর দোকান ও ব্যবসায়ীক কার্যক্রমের সূত্র ধরে এলাকাটি ‘হাজী বাজার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেছিল। পরে কালক্রমে ‘হাজীবাজার’ থেকে ‘হাজীগঞ্জ’ নামে প্রতিষ্ঠা পায়। হাজী সাহেবের পরবর্তী বংশধর আহমাদ আলী পাটওয়ারীর মাধ্যমে ‘হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ’ প্রতিষ্ঠিত হলে মসজিদের সুবাদে এলাকাটি বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। এ মসজিদ উপলক্ষে হাজীগঞ্জে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত বেড়ে যায়। এভাবে হাজীগঞ্জের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও লোকসমাগম বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালে হাজীগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আহমাদ আলী পাটওয়ারীর পরবর্তী পুরুষ ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারী বড় মসজিদের মোতাওয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কিছু উদ্যমী কর্মসূচী গ্রহণ করেন। তাঁর আমলে তাঁর সেই উদ্যমী কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় মসজিদ কমপ্লেক্সকে ঘিরে হাজীগঞ্জ একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। আর বর্তমানে হাজীগঞ্জের সার্বিক পরিধি একটি জেলা শহরের সাথে তুলনীয়। হাজীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীক কার্যক্রমের পরিধি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে হাজীগঞ্জের মূল রাস্তাটিতে এখন প্রায়শই যানজট লেগে থাকে। উক্ত যানজটের ভাবনা নিয়ে গত পনের বছর যাবৎ ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারী পত্র- পত্রিকায় লেখালেখি করে যাচ্ছেন। সে প্রেক্ষিতে বাজারের অতি নিকটবর্তী স্থান দিয়ে বাইপাস সড়ক তৈরির একটি তিনি নকশাও প্রণয়ন করেন এবং এবিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। দূরপাল্লার মালামাল ও মনুষ্য পরিবহনের জন্য ইতিমধ্যে এলাকাবাসীর মধ্যে বাইপাস সড়কের দাবী জোড়ালো হয়ে উঠেছে। এভাবে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে হয়ত হাজীগঞ্জ একটি জেলা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.